কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৪৫
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ اِذَا قَرَاۡتَ الۡقُرۡاٰنَ جَعَلۡنَا بَیۡنَكَ وَ بَیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ حِجَابًا مَّسۡتُوۡرًا ﴿ۙ۴۵﴾
সরল অনুবাদ
৪৫. আর আপনি যখন কোরআন পাঠ করেন, তখন আমরা আপনার ও যারা আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে না তাদের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন পর্দা রেখে দিই।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতটি মূলত কোরআনের প্রভাব, কাফিরদের মানসিক অবস্থা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর আরোপিত গায়েবি প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে।
আয়াতে উল্লিখিত ‘حِجَابًا مَّسْتُورًا’ — অদৃশ্য পর্দার অর্থ সম্পর্কে ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এখানে ‘হিজাবান মাসতুরা’ দ্বারা উদ্দেশ্য এমন এক পর্দা, যা মানুষের চোখে দৃশ্যমান নয়; কিন্তু তা তাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। এটি শারীরিক পর্দা নয়, বরং মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিবন্ধকতা।
(তাফসির আত-তাবারী, সুরা : ইসরা, আয়াত : ৪৫)তিনি আরো বলেন, ‘মাস্তূর’ শব্দটি এখানে ‘সাতির’ (আবরণকারী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এমন এক পর্দা যা নিজে অদৃশ্য কিন্তু সত্য উপলব্ধিকে আচ্ছাদিত করে।
‘হিজাবান মাসতুরা’ দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন মুশরিকরা তা শোনার পরও উপকৃত হতে পারত না। কারণ আল্লাহ তাদের অন্তরে এক প্রকার পর্দা সৃষ্টি করতেন।
তিনি বলেন, এর বাস্তব উদাহরণ হলো— নবী (সা.) কাবার পাশে কোরআন তিলাওয়াত করতেন, অথচ অনেক সময় মুশরিকরা তাঁকে দেখতে বা ক্ষতি করতে পারত না। এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ হিফাজত। (তাফসির ইবনে কাসীর, ৩/৫২)
ইবনে কাসীর আরো বলেন, পরবর্তী আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে : যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ বসিয়ে দিই, যাতে তারা তা বুঝতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা সৃষ্টি করি।’
‘হিজাবান মাসতুরা’ দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, এখানে দুটি দিক রয়েছে : (১) বাস্তবিক দিক: আল্লাহ কখনও কখনও নবী (সা.)-কে শত্রুদের দৃষ্টির আড়ালে রাখতেন।
(২) রূপক দিক: তাদের অন্তরে এমন অন্ধত্ব সৃষ্টি করা হয়েছিল, যার কারণে তারা কোরআনের হেদায়াত বুঝতে পারত না। তিনি বলেন, ‘মাস্তূর’ শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে— এটি এমন এক পর্দা, যা দৃষ্টিগোচর নয়; বরং অদৃশ্যভাবে কাজ করে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন, ১০/২৭২)‘হিজাবান মাসতুরা’ দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.) তাঁর তাফসিরে বলেন, কোরআনের আয়াত শোনার পরও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তরে পূর্ব থেকেই এক প্রকার অহংকার ও বিদ্বেষ থাকে। ফলে আল্লাহ তাদের উপর এমন এক আধ্যাত্মিক পর্দা সৃষ্টি করেন, যা তাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। তিনি যুক্তি দেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ।
কারণ তারা স্বেচ্ছায় সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে। (তাফসির আল-কাবীর, ২১/২৪)এই আয়াত আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে। কোরআন নিজে নূর, হেদায়াত ও রহমত। কিন্তু যার অন্তর আখিরাতবিমুখ, অহংকারে পূর্ণ এবং সত্য প্রত্যাখ্যানে অভ্যস্ত। তার জন্য কোরআন কার্যকর হয় না। আল্লাহ তার ও সত্যের মধ্যে অদৃশ্য পর্দা স্থাপন করেন।
অতএব, কোরআন তিলাওয়াতের সময় আমাদের অন্তরকে বিনয়, ঈমান ও আখিরাত-সচেতনতার মাধ্যমে প্রস্তুত করা জরুরি। অন্যথায় শব্দ কানে প্রবেশ করবে, কিন্তু হেদায়াত অন্তরে পৌঁছাবে না।