হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরা গুহার নির্জনতায় বসে বিশ্বময় মানুষের মুক্তির চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়েন। তার এরূপ ভাবান্তর আরম্ভ হয় ৩৫ বছর বয়স থেকে। পারিবারিক ও সামাজিক কার্যকলাপের সাথে সাথে তিনি বিশ্বের সৃষ্টি-রহস্য সম্বন্ধে চিন্তায় ব্যাকুল থাকতেন।
হেরা গুহায় নবীজি
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ৪০ বছরে পদার্পণ করলেন, ক্রমান্বয়ে তিনি নির্জনতাপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলেন। যৎসামান্য খাবার-পানীয় সঙ্গে নিয়ে মক্কা নগরী হতে দু-মাইল দূরত্বে অবস্থিত হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতে লাগলেন।
হেরাগুহা হচ্ছে ক্ষুদ্র আকার-আয়তনের একটি গুহা। এর দৈর্ঘ্য চার গজ এবং প্রস্থ পৌনে দু-গজ। এর নীচ দিকটা তেমন গভীর ছিল না। একটি ছোট্ট পথের প্রান্তভাগে অবস্থিত পর্বতের উপরিঅংশের একত্রে মিলেমিশে ঠিক এমন একটি আকার-আকৃতি ধারণ করেছিল, যা শোভাযাত্রার পুরোভাগে অবস্থিত আরোহীশূন্য সুসজ্জিত অশ্বের মতো দেখায়।
পুরো রমজান রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরাগুহায় অবস্থান করে আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকেন। বিশ্বের দৃশ্যমান বস্তুনিচয়ের অন্তরাল থেকে যে মহাশক্তি প্রতিটি মুহূর্তে সকল কিছুকে জীবন, জীবিকা ও শক্তি জাগিয়ে চলেছেন, সেই মহা মহীয়ান সত্তার ধ্যানে মশগুল থাকতেন। স্বগোত্রীয় লোকদের অর্থহীন বহুত্ববাদী বিশ্বাস ও পৌত্তলিক ধ্যানধারণা তার অন্তরে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করত। কিন্তু তার সামনে এমন কোনো পথ খোলা ছিল না যে পথ ধরে তিনি শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে পদচারণা করতে সক্ষম হতেন। (ইবনু হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. : ২৩৫-২৩৬; ফি যিলালিল কুরআন, খণ্ড ২৯, পৃ. : ১৬৬)
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্জনপ্রিয়তা ছিল প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার ব্যবস্থাপনার একটি অংশ। এভাবে আল্লাহ তাআলা ভবিষ্যতের এক মহতী কর্মসূচির জন্য তাঁকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন।
যে আত্মার নসিবে নবুওয়াতরূপী এক মহান আসমানি নেয়ামত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে এবং যিনি পথভ্রষ্ট ও অধঃপতিত মানুষকে সঠিক পথ-নির্দেশনা দিয়ে করবেন ধন্য, তার জন্য যথার্থই প্রয়োজন সমাজজীবনের যাবতীয় ব্যস্ততা, জীবনযাত্রা নির্বাহের যাবতীয় ঝামেলা এবং সমস্যা থেকে মুক্ত থেকে নির্জনতা অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা।
আল্লাহ তাআলা যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্বব্যবস্থায় সবচাইতে মর্যাদাশীল ও দায়িত্বশীল-আমানতদার মনোনীত করে দুনিয়াতে পাঠান। তার কাঁধে দায়িত্বভার অর্পণের মাধ্যমে বিশ্বমানবের জীবনবিধানের রূপরেখা পরিবর্তন করতে চাইলেন। প্রবর্তন করতে চাইলেন অর্থহীন আদর্শের জঞ্জাল সরিয়ে শাশ্বত আদর্শের আঙ্গিকে ইতিহাসের পরিমার্জিত ধারা।
তখন নবুওয়াত প্রদানের প্রাক্কালে তার জন্য এক মাসব্যাপী নির্জনতা অবলম্বন অপরিহার্য করে দিলেন। যাতে তিনি গভীর ধ্যানের সূত্র ধরে দিব্যজ্ঞান লাভের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হন।
নির্জন হেরাগুহার সেই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি বিশ্বের আধ্যাত্মিক জগতে পরিভ্রমণ করতেন এবং সকল অস্তিত্বের অন্তরালে লুক্কায়িত অদৃশ্য রহস্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করতেন, যাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্দেশ আসামাত্রই তিনি বাস্তবায়নের ব্যাপারে তীব্র হতে পারেন। (ফি যিলালিল কুরআন, খণ্ড ২৯, পৃ. : ১৬৬-১৬৭)