সারাদেশে তীব্র লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে জনজীবন এখন চরম ভোগান্তিতে। গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই নেমে এসেছে দুর্ভোগ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বৈশাখের তীব্র গরমে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গৃহিণীরা ফ্রিজে রাখা খাদ্য সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অন্যদিকে, ঠিক এই সময়েই শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা—লোডশেডিংয়ের কারণে চরম বিপাকে পড়েছে পরীক্ষার্থীরা।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত। কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, স্থবির হয়ে পড়েছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম।
তবে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে কৃষি খাত, বিশেষ করে বোরো ধান উৎপাদন। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই বোরো মৌসুম থেকে। ফলে এই ফসলের ওপরই নির্ভর করছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
কিন্তু বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকটে সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। ফলে ধানের শীষ ঠিকমতো গঠন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।
এদিকে, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করায় কৃষকদের খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মোট চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে।
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর। ফলে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সব খাতে পড়ে। কৃষকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সংকটের ভয়াবহ চিত্র।
রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের অভাবে সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কৃষকরা মাইলের পর মাইল ঘুরেও তেল পাচ্ছেন না। ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ।
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসায় তীব্র লোডশেডিং চলছে। এতে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা খাতে একযোগে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বরিশাল অঞ্চলে বাড়তি সেচ ব্যয়ের কারণে কৃষকরা উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায়। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে—ডিলার পর্যায়ে সিন্ডিকেটের কারণে তেল বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। এতে বোরো আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষকরা চতুর্মুখী সংকটে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শুধু কৃষিই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কৃষকদের সেচ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। অন্যথায় এর প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারদর—সবকিছুর ওপর।
মন্তব্য করুন