পৃথিবীর ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। সময়ের আবর্তনে পৃথিবীতে অনেক মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। যারা আপন কর্ম, বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক মাধুর্যে ইতিহাসের পাতায় সদা দেদীপ্যমান হয়ে আছেন। সেই মহামনীষীদের মধ্যে কেবল হজরত মুহাম্মদ (সা.) একমাত্র ব্যক্তিত্ব; যিনি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শের স্থপতি ছিলেন। শুধু তাই নয়, তার সেই আদর্শ তখনকার এবং অনাগত সব মানুষের জন্য সর্বোত্তম, সর্বোন্নত ও সর্বোৎকৃষ্ট। পৃথিবীর উদার চিন্তাশীল মহল বিনা সংকোচে সেটি স্বীকার করে। জীবন ও জগতের খুঁটিনাটি থেকে বৃহৎ সব ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) ছিলেন সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ। তেমনি একটি ভৌগোলিক সীমারেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবেও তিনি মানব ইতিহাসের পাতায় আপন মহিমায় চিরভাস্বর। তিনি ছিলেন পরশ পাথরতুল্য। যার ছোঁয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষগুলো সবচেয়ে ভালো মানুষে পরিণত হয়েছে। লুণ্ঠিত সমাজ ফিরে পেয়েছে মানবতা। আশ্রয়হীন সমাজ আশ্রিত হয়েছে নীতিবান এক সমাজে। তিনিই গড়ে তুলেছেন জীর্ণ-শীর্ণ ঘুণেধরা রাষ্ট্রকে একটি আদর্শ রাষ্ট্রে এবং সর্বত্রই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরা হলো।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল। খলিফা হজরত ওমর (রা.) ও উবাই ইবনে কাব এক মামলার বাদী-বিবাদীরূপে আদালতে উপস্থিত হলে বিচারক জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) খলিফাকে বসার জন্য একটি আসন এগিয়ে দিলেন। খলিফা তার প্রতিবাদ করে বলেন, এটা আপনার প্রথম অন্যায়। অতঃপর তিনি বিচারকের সামনে বিবাদীর সঙ্গে একই সারিতে বসে পড়েন।
ফলে সবাই সবার অভিযোগ নির্ভয়ে আদলতে পেশ করতে পারত।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ন্যায়নিষ্ঠা : ইসলাম একমাত্র পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থার নাম। ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা ও বাক স্বাধীনতার কথা বলে। সমাজের পিয়ন থেকে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সবার অধিকার কেবলমাত্র ইসলামই সুনিশ্চিত করেছে, এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। ইসলাম শুধুমাত্র শাসকের অধিকার নিশ্চিত করেছে তা কিন্তু নয়, শাসকের অধিকারের পাশাপাশি শাসিতের ন্যায্য অধিকারও প্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল (সা.) দেশের জনগণের মধ্যে একবিন্দু বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন না করার জন্য দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রের কর্মচারীদের প্রতি কঠোর নির্দেশ দিয়ে রাখতেন। তিনি নিজে কোনো তোষামোদ বা প্রশংসা পছন্দ করতেন না। এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো আল্লাহর রাসুল (সা.) সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে দেশের জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রধানের সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করতে হতো না। বিচারের নামে কেউ অবিচার বা শাসনের নামে কেউ দুঃশাসন করেছে তা প্রমাণিত হলে তিনি কঠোরভাবে তার বিচার করতেন। বিচার পদ্ধতির ন্যায়নিষ্ঠতা নিশ্চিত করার প্রয়াসে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে বিচারককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আদেশ দিয়েছেন।
পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করা : রাসুল (সা.) রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। আল্লাহর নির্দেশও ছিল এমন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ সভা করুন। আর যখন কাজ শুরু করবেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫৯)
পররাষ্ট্রনীতি : রাসুল (সা.) প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়পূর্ণ বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বসবাসের লক্ষ্যে সৎ ও নিরপেক্ষনীতি গ্রহণ করেন। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারকরণ।’ ধারাবাহিকভাবে পত্রের মাধ্যমে তিনি অধিকাংশ রাজা-বাদশাহর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। এ প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন। কেউ কেউ অস্বীকারও করেছিলেন। কিন্তু এভাবে পত্র আদান-প্রদানের ফলে মোটা দাগে যে ফায়দাটা হয়েছিল, আল্লাহর মনোনীত ইসলাম ধর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেছিল।
সনদ প্রণয়ন : রাসুল (সা.) কোরআনের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে মদিনার সব গোত্রের সমন্বয়ে ‘মদিনা সনদ’ নামে একটি সনদ প্রণয়ন করেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত ‘শাসনতন্ত্র’ নামে পরিচিত। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
প্রদেশ বিভক্তিকরণ : রাসুল (সা.) রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পাদনের সহজার্থে এবং সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য দেশকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক প্রদেশের জন্য উপযুক্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও বিচারক নিযুক্ত করেন। ইতিহাসে যা ‘প্রদেশ বিভক্তিকরণ নীতি’ নামে অভিহিত। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)
নেশাজাতীয় দ্রব্য নিষিদ্ধকরণ : মদ আর নেশাজাতীয় জিনিসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল আরবের জন্মগত স্বভাব। ধাপে ধাপে মদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে সমাজ থেকে অন্যায়-অনাচার দূর হয়। শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব নেশাদার দ্রব্য মদ। আর সব ধরনের মদ হারাম। যে ব্যক্তি সর্বদা নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করে তওবা ছাড়াই মারা যাবে সে পরকালে সুস্বাদু পানীয় পান করতে পাবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
সুদ-ঘুষ প্রত্যাহার : সুদ-ঘুষ ছিল সেকালের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক হাতিয়ার। এর মাধ্যমে সমাজের একশ্রেণির লোক সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করত। ফলে ধনী আরও ধনী হতো। আর গরিব হতো সর্বহারা অসহায়। রাসুল (সা.) সুদ-ঘুষের প্রথা বন্ধ করে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন, আর সুদ হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৫) রাসুল (সা.) কর্জে হাসানার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেন ব্যাপকভাবে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এমন ব্যক্তি কে আছে, যে আল্লাহকে কর্জে হাসানা প্রদান করবে? তাহলে তার সেই কর্জকে তার জন্য আল্লাহ বহুগুণ বর্ধিত করে দেবেন।’ (সুরা বাকারা ২৪৫)
শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা : রাসুল (সা.) শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার ভাইকে তার অধীন করেছেন সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে খায়, সে কাপড় পরিধান করায় যা সে পরিধান করে। তাকে সামর্থ্যরে বেশি কোনো কাজের দায়িত্ব দেবে না। যদি এমনটা করতেই হয় তাহলে সে যেন তাকে সাহায্য করে। (সহিহ বুখারি ৫৬১৭) উপযুক্ত বেতন ও পারিশ্রমিক দ্রুত সময়ে আদায়ের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ ২৪৪৩)
সম্পদের সুষম বণ্টন : তৎকালীন আরবদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছিল ভঙ্গুর। মহানবী (সা.) সম্পদের সুষম বণ্টনে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি কায়েম করেন এবং উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তুলে দিয়ে একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টনব্যবস্থা কায়েম করেন।
নৈতিকতার উন্নতি : সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক মান উন্নতি করার প্রয়াসে মদ্যপান, জুয়াখেলা, রাহাজানি, নারী ধর্ষণ, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন ইত্যাদি অপরাধকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায়, পাপ ও কুসংস্কার দূর করে সমাজব্যবস্থায় এনেছিলেন এক সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী বিপ্লব।
বর্তমান অবস্থা : বর্তমান পৃথিবীর প্রচলিত বিচারব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, আইনি কাঠামোর অস্বচ্ছতা, আইনের সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা জটিলতা। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষমতাসীনদের জন্য বিচারের রায় হয় স্বস্তির। অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে থাকা ব্যক্তি বা দলগুলোর জন্য হয় অস্বস্তির। যার ফলে বিশ্বব্যাপী ইনসাফ ও ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত। অথচ রাসুল (সা.) সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সংরক্ষণে এক আপসহীন যোদ্ধা ছিলেন। তাই পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই নববী আদর্শের দিকে। তাহলেই আসবে সফলতা। শান্তি ফিরবে রাষ্ট্র ও সমাজে।
মন্তব্য করুন