চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনের পর জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চলছে। সংসদে উত্থাপনের পর এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, যাদের ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।
বিশেষ কমিটির একাধিক বৈঠকে আলোচনা শেষে অন্তত ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাতিলের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এর বৈধতা নিয়ে ইতোমধ্যে হাইকোর্টে রুল জারি হওয়ায় সরকার নিজেও এখন এটি পাসের পক্ষে নেই।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫-এ অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতে কেন্দ্রীভূত করার বিধান রাখা হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এতে বিচার বিভাগে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫-এ একটি স্থায়ী কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব ছিল। তবে এ নিয়েও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি কমিটি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫-এ কমিশনের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিতর্ক তৈরি করেছে।
একইভাবে দুদক সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫-এ কমিশনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, মেয়াদ কমানো এবং প্রতি ছয় মাসে কার্যক্রম প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়—যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
অর্থনৈতিক খাতেও বড় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে। এতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বিলুপ্ত করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এছাড়া বেসামরিক বিমান চলাচল সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬-এ বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা আনার জন্য উপদেষ্টা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব ছিল।
অন্যদিকে, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ ২০২৫-এ অঙ্গদানের পরিধি বাড়ানো হলেও এটি নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং বাতিলের তালিকায় রয়েছে।
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, এসব অধ্যাদেশ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
প্রথমত, জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য
দ্বিতীয়ত, সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা।
১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করে মূল্যায়ন করা হয়েছে—
কিছু অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে বিল আকারে পাস হবে,
কিছু সংশোধন করে পুনরায় আনা হবে,
আর যেগুলোতে ঐকমত্য নেই, সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে এসব অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সে অনুযায়ী, ১২ মার্চ শুরু হওয়া অধিবেশনের পর ১২ এপ্রিলের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাড়াহুড়ো করে অনেক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যার মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। তাই আপাতত কিছু অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে নতুনভাবে বিল আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিতর্কিত আইনগুলো বাদ দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও সাংবিধানিক কাঠামো নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল হলে দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে।
মন্তব্য করুন