নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা ডিপো থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে জেট ফুয়েল পরিবহনের পথে ভয়াবহ তেল চুরির ঘটনায় দুই কর্মীকে বদলি করে দায় এড়ানোর অভিযোগ উঠেছে, অথচ মূল হোতারা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছে—এমন অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি খাতজুড়ে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ডিপার কামাল হোসেন ও ইসমাঈলকে কুর্মিটোলা ডিপো থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলি করা হলেও, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কুর্মিটোলা ডিপোর চালান সইকারী কর্মকর্তা সমীর, গোদনাইল পদ্মা ডিপোর মিটারম্যান রবি এবং ফেন্সি মনির মন্ডল এখনো বহাল রয়েছেন।
এতে করে প্রশ্ন উঠেছে—তদন্ত কি শুধুই ‘নিম্নস্তরের বলি’ খুঁজে বের করার জন্য ?
জানা গেছে, গত ১১ মার্চ গোদনাইল পদ্মা ডিপো থেকে ছেড়ে আসা অন্তত চারটি জেট ফুয়েলবাহী ট্যাংকার কাগজে-কলমে কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছালেও বাস্তবে প্রায় ৭২ হাজার লিটার তেল রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলোর নম্বর—৪১-০৭০০, ৪২-০২৫২, ৪১-০৬৪৯ ও ৪১-০৬৯৮।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো অপারেশনের নেপথ্যে ছিলেন সমীর, যিনি খালি ট্যাংকারকেও তেলভর্তি দেখিয়ে চালানে স্বাক্ষর করেছেন। আর গোদনাইল ডিপো থেকে ট্যাংকার ছাড়ার আগেই মিটারম্যান রবি ও ফেন্সি মনির মন্ডল কোন গাড়ি পথে তেল পাচার করবে, তার ‘সবুজ সংকেত’ দিয়ে দিতেন। তাদের এই সমন্বিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চলত তেল লোপাটের কারবার।
সূত্র জানায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় এবং অতীতেও তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে রবি ও মনির বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বাড়ি, গাড়ি, জমিজমা—সবই গড়ে উঠেছে এই অবৈধ তেল বাণিজ্যের টাকায়।
এদিকে, ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
গত ১৪ মার্চ তদন্ত দল কুর্মিটোলা ডিপোতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ, ট্যাংকার চলাচলের তথ্য ও জ্বালানি মজুদের হিসাব যাচাই করে। তদন্তে নেতৃত্ব দেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) ও হেড অব ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স মো. শফিউল আজম, ব্যবস্থাপক পেয়ার আহাম্মদ এবং কর্মকর্তা কে এম আবদুর রহিম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, কাগজে ট্যাংকার পৌঁছানোর প্রমাণ থাকলেও বাস্তবে তেল অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে—এমন শক্ত প্রমাণ মিলেছে। তবুও এখন পর্যন্ত মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “কামাল-ইসমাঈলকে সরিয়ে দায় শেষ করা যাবে না। মূল হোতা সমীর, রবি ও ফেন্সি মনিরকে আইনের আওতায় না আনলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।”
এ ঘটনায় সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, জেট ফুয়েল মূলত বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হলেও অসাধু চক্র এটি অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে অবৈধভাবে বাজারজাত করছে—যা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, এখনো ‘বড় মাছ’ ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—
তেল চুরির এই রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি বদলির নাটকেই শেষ হবে সব ?
মন্তব্য করুন